কাঙাল হরিনাথ অসাম্প্রদায়িক বাউল…
কুষ্টিয়া জেলার
কুমারখালি ধরে হাঁটছি,এই পদ্মার পাড় দিয়ে আর গড়াইয়ের কোল ঘেঁষা ঐতিহাসিক একটি জায়গা।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমি। যেখান থেকে বিপ্লবী
বাঘা যতীনের উত্থান, জমিদার দর্পণ’র
নাট্যকার মীর মোশাররফ হোসেনের ক্রমশ বিপ্লবী লেখক হয়ে ওঠা এবং লালনের বিপ্লবী ন্যাংটা
বাহিনীর ইংরেজ লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস। কিন্তু এরও মধ্যে লুকিয়ে
আছে এক বিস্ময়কর ইতিহাস।আমি কাকে খুঁজচ্ছি।
দিদা খুব গাইতো
‘হরি দিন তো গেলো, সন্ধ্যা হলো
পার করো আমারে’ আমিও আজ পাড়ের খোঁজে।কুন্ডুপাড়ায় এসে মা কে মনে পড়ছে খুব আর তক্ষুনি মনে হলো
আরে এখানেই তো আমার সন্ধান।তাকে খুঁজে নেবার।মনে তখন সুর ভাঙছি ‘যদি ডাকার মতন পরিতাম ডাকতে। তবে কি মা,এমন করে,তুমি
লুকায়ে থাকতে পারতে।।’ চোখ ঝাপসা হয়ে আসে মৃত্যুদিনের নীরবতায় দেখি
ভেসে উঠছে সময় সেই বিস্ময়কর ইতিহাস।আমি তখন ফিরে যাচ্ছি অন্য এক ফেলে আসা সময় ১৮৩৩
খ্রি:এর এক যাত্রায় একা।
১২৪০ বঙ্গাব্দ ও ২২ জুলাই ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ কুষ্টিয়া জেলার গড়াই তীরবর্তী কুমারখালী গ্রামের কুণ্ডুপাড়ায় জন্ম নেয় এক শিশু। আর্থিক টানাপড়েনে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি। কিন্তু তরুণ বয়সেই অসহায় মানুষের পক্ষে কাজ শুরু করে সে। সেসময় ব্রিটিশ শাসকদের নির্যাতনের শিকার গ্রাম-বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের কথা লিখতে থাকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায়। অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হলেও অবহেলিত সমাজের বৈষম্য এবং জমিদারদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সচেতন করে তোলার জন্য ১৮৬৩ সালে কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করে সে। পরে পত্রিকাটি পাক্ষিক ও তার কিছু পরে সাপ্তাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এক পয়সা মূল্যের এই পত্রিকাটিতে অবিরাম নীলকর ও জমিদারদের নানা জুলুমের কথা প্রকাশ করতে থাকে। পত্রিকাটি প্রকাশের সুবিধার্থে ১৮৭৩ সালে একটি ছাপাখানা স্থাপন ও করে। পত্রিকাটি সেইসময়ে নির্যাতিত কৃষক ও প্রজাদের পক্ষের একটি পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু সরকারের কঠোর মুদ্রণনীতি ও নানা বিরোধিতায় ১৮ বছর প্রকাশের পর ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই উনিশ শতকে গ্রামের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে এমন একটি পত্রিকা প্রকাশের কারণে সেই মানুষটি অমর হয়ে রয়েছে।
১২৪০ বঙ্গাব্দ ও ২২ জুলাই ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ কুষ্টিয়া জেলার গড়াই তীরবর্তী কুমারখালী গ্রামের কুণ্ডুপাড়ায় জন্ম নেয় এক শিশু। আর্থিক টানাপড়েনে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি। কিন্তু তরুণ বয়সেই অসহায় মানুষের পক্ষে কাজ শুরু করে সে। সেসময় ব্রিটিশ শাসকদের নির্যাতনের শিকার গ্রাম-বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের কথা লিখতে থাকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায়। অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হলেও অবহেলিত সমাজের বৈষম্য এবং জমিদারদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সচেতন করে তোলার জন্য ১৮৬৩ সালে কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করে সে। পরে পত্রিকাটি পাক্ষিক ও তার কিছু পরে সাপ্তাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এক পয়সা মূল্যের এই পত্রিকাটিতে অবিরাম নীলকর ও জমিদারদের নানা জুলুমের কথা প্রকাশ করতে থাকে। পত্রিকাটি প্রকাশের সুবিধার্থে ১৮৭৩ সালে একটি ছাপাখানা স্থাপন ও করে। পত্রিকাটি সেইসময়ে নির্যাতিত কৃষক ও প্রজাদের পক্ষের একটি পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু সরকারের কঠোর মুদ্রণনীতি ও নানা বিরোধিতায় ১৮ বছর প্রকাশের পর ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই উনিশ শতকে গ্রামের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে এমন একটি পত্রিকা প্রকাশের কারণে সেই মানুষটি অমর হয়ে রয়েছে।
সেই
বিস্ময়কর ইতিহাসের মানুষটির নাম হরিনাথ মজুমদার অর্থাৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার।উনিশ শতকের
ভারতবর্ষ আর এই বাংলা ভূখণ্ড মূলত ইংরেজ শাসনের কফিন তৈরি করেছে। সেসময় কাঙাল হরিনাথের
আবির্ভাব হয়েছিলো সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে সংবাদপত্রের মধ্য দিয়ে, বাংলা ১২৭০ সালের পহেলা
বৈশাখ। এই সেই ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ যার পাতায় পাতায় একজন গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক
তুলে এনেছিলেন ইংরেজ শাসনের দুরাচার, অন্যায়। আবার তুলে এনেছিলেন মুক্তির পথ। তার
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিপ্লবের শপথ, মুখবন্ধ, বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা। অনুপ্রাণিত
করা হয়েছে বিপ্লবীদের। আবার আঘাত করা হয়েছে ব্রিটিশ শাসনের মূলে। এই মানুষটি, যার
সাহস আর সংগ্রামে কেঁপে উঠেছিলো শাসকগোষ্ঠী, যাকে হত্যা করার জন্য ইংরেজদের ঘুম হারাম
হয়ে যায়, তার লেখনীই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। লালন সাঁইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাঙাল
হরিনাথকে একবার জমিদারদের লাঠিয়ালরা ধরে নিয়ে যেতে আসছে শুনে লালন তার বাউলদের দলবল
নিয়ে যে ঘরে তাকে পাহারা দিয়েছিলেন, সেটি উপমহাদেশের বিখ্যাত এম.এন প্রেস। প্রসঙ্গত
বলে রাখা উচিত, কাঙাল হরিনাথের বংশভিটা কুমারখালির কুণ্ডুপাড়া উপমহাদেশের প্রথম প্রেস
বা ছাপাখানা। কাঙাল হরিনাথ প্রথম ছাপাখানা তৈরি করেন তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ কে সচল রাখার জন্য।
নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাদের হৃদয় কোঠায় স্থান করে নেন। শত বাধা উপেক্ষা করে অসীম সাহসের সঙ্গে তিনি লিখেছেন ইংরেজদের দুঃশাসন, নীলকর, জোতদার জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে। এ পত্রিকাটি কালক্রমে প্রথমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এতে কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কাহিনীর পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হতো।
বাউল সঙ্গীতকে সামাজিক জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মানসে উনবিংশ শতকে যে কয়েকজন সাহিত্য সাধক নিজেদের সাহিত্যে নিয়োজিত করেছিলেন, কাঙাল হরিনাথ তাদের মধ্যে অন্যতম পথিকৃত। বাংলা ভাষার ওপর কাঙাল হরিনাথের দখল ছিলো অসাধারণ। এর ফলে তিনি হয়েছিলেন এক কালোত্তীর্ণ সাহিত্যসাধক। যে যুগে হরিনাথ সাহিত্য সাধনা করেন সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভাষা ও কল্পনার যুক্তভঙ্গি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়।
নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাদের হৃদয় কোঠায় স্থান করে নেন। শত বাধা উপেক্ষা করে অসীম সাহসের সঙ্গে তিনি লিখেছেন ইংরেজদের দুঃশাসন, নীলকর, জোতদার জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে। এ পত্রিকাটি কালক্রমে প্রথমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এতে কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কাহিনীর পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হতো।
বাউল সঙ্গীতকে সামাজিক জীবনধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মানসে উনবিংশ শতকে যে কয়েকজন সাহিত্য সাধক নিজেদের সাহিত্যে নিয়োজিত করেছিলেন, কাঙাল হরিনাথ তাদের মধ্যে অন্যতম পথিকৃত। বাংলা ভাষার ওপর কাঙাল হরিনাথের দখল ছিলো অসাধারণ। এর ফলে তিনি হয়েছিলেন এক কালোত্তীর্ণ সাহিত্যসাধক। যে যুগে হরিনাথ সাহিত্য সাধনা করেন সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভাষা ও কল্পনার যুক্তভঙ্গি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়।
হরিনাথ
কে জানার এক অমোঘ টান ঘিরে ধরেছে।এমন একটি চরিত্রের ভিতরে ডুব দিতে গিয়ে দেখি চোখের
সামনে খুলে যাচ্ছে একটি মানুষের ভেতরে থাকা সুপ্ত অনন্য এক মানুষের বহুধর প্রতিভার
বিচ্ছুরণ।
হরিনাথের অন্যতম পরিচয় সাহিত্যসেবী হিসেবে। তবে বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে নয়, হরিনাথ ‘সুনীতি’, ‘ধর্মভাব’ ও ‘লোকশিক্ষা’র প্রয়োজনেই লেখনী ধারণ করেন। সেই দিক দিয়ে বিচার করলে তাঁর রচনা এক অর্থে লোকশিক্ষারই বাহন। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে হরিনাথ প্রায় চল্লিশখানা গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য এর মধ্যে সবই যে বই-আকারে প্রকাশিত হয়েছিল তা নয়। হরিনাথের রচনাবলিকে নীতিশিক্ষামূলক শিশুপাঠ্য, ধর্মকথার বিনোদন শিল্পরূপ, ধর্মশাস্ত্র ও সাধনতত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, সামাজিক চিন্তামূলক এবং সাহিত্য-রসাশ্রিত - এই কয় শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা চলে। আখ্যান বিজয়-বসন্তের লেখক ও পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক পরিচয়ের বাইরে কাঙাল হরিনাথ বাঙালিসমাজে মূলত মরমিভাবের বাউলগানের রচয়িতা হিসেবেই পরিচিত।মরমিগানের সঙ্গে কাঙাল হরিনাথের সম্পর্ক অতি নিবিড়। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘শখের বাউল’ হিসেবে তাঁর আবির্ভাব হলেও শেষ পর্যন্ত এই বাউলগানের সূত্রেই হরিনাথ তাঁর সাধন-অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন এবং তাঁর শিল্প-শক্তির যথার্থ পরিচয়ও এর মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর লোকপ্রিয়তা ও পরিচিতির মূলেও রয়েছে এই বাউলসংগীত। তাঁর জীবনদর্শন, অধ্যাত্মভাবনা ও মরমি-মানসের পরিচয় বিধৃত রয়েছে এসব গানে।এইটুকু সন্ধান করতেই হাতে এলো জলধর সেন এর বই,সেই বই পড়তে পড়তে গিয়ে এক জায়গায় আটকে যাই।ওই বইয়ের এক জায়গায়
হরিনাথের অন্যতম পরিচয় সাহিত্যসেবী হিসেবে। তবে বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে নয়, হরিনাথ ‘সুনীতি’, ‘ধর্মভাব’ ও ‘লোকশিক্ষা’র প্রয়োজনেই লেখনী ধারণ করেন। সেই দিক দিয়ে বিচার করলে তাঁর রচনা এক অর্থে লোকশিক্ষারই বাহন। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে হরিনাথ প্রায় চল্লিশখানা গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য এর মধ্যে সবই যে বই-আকারে প্রকাশিত হয়েছিল তা নয়। হরিনাথের রচনাবলিকে নীতিশিক্ষামূলক শিশুপাঠ্য, ধর্মকথার বিনোদন শিল্পরূপ, ধর্মশাস্ত্র ও সাধনতত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, সামাজিক চিন্তামূলক এবং সাহিত্য-রসাশ্রিত - এই কয় শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা চলে। আখ্যান বিজয়-বসন্তের লেখক ও পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক পরিচয়ের বাইরে কাঙাল হরিনাথ বাঙালিসমাজে মূলত মরমিভাবের বাউলগানের রচয়িতা হিসেবেই পরিচিত।মরমিগানের সঙ্গে কাঙাল হরিনাথের সম্পর্ক অতি নিবিড়। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘শখের বাউল’ হিসেবে তাঁর আবির্ভাব হলেও শেষ পর্যন্ত এই বাউলগানের সূত্রেই হরিনাথ তাঁর সাধন-অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন এবং তাঁর শিল্প-শক্তির যথার্থ পরিচয়ও এর মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর লোকপ্রিয়তা ও পরিচিতির মূলেও রয়েছে এই বাউলসংগীত। তাঁর জীবনদর্শন, অধ্যাত্মভাবনা ও মরমি-মানসের পরিচয় বিধৃত রয়েছে এসব গানে।এইটুকু সন্ধান করতেই হাতে এলো জলধর সেন এর বই,সেই বই পড়তে পড়তে গিয়ে এক জায়গায় আটকে যাই।ওই বইয়ের এক জায়গায়
এ-প্রসঙ্গে
জলধর
সেন
লিখেছেন
:
কাঙাল হরিনাথ, পূবর্ববঙ্গের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার নিকটে তাঁহার বাউলসঙ্গীতের দ্বারাই অসামান্য লোক বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। এই বাউলসঙ্গীতের সহজ সরল প্রাণস্পর্শী কথায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবর্বশ্রেণীর লোকই মুগ্ধ হইতেন। অল্পদিনের মধ্যে বাউলসঙ্গীতের মধুর উদাস সুর হাটে, ঘাটে, মাঠে, নৌকাপথে সবর্বত্রই শ্রুত হইত।
হরিনাথ বাউলগানের একটি ভিন্ন ‘ঘরানা’ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ‘কাঙাল’ ও ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতায় পরমার্থসূচক যেসব বাউলাঙ্গের মরমিগান রচনা করেন তার সংখ্যা প্রায় হাজারের কোঠায়। তাঁর এই বাউলসংগীতের স্বরূপ ও জনমনে তার প্রভাব সম্পর্কে জানা যায় :
অনেক সঙ্গীতে সংসারের অনেক সুখদুঃখের কথা ধ্বনিত হইয়াছে বটে, কিন্তু কাঙ্গাল হরিনাথের বাউলসঙ্গীতে হৃদয়ের মধ্যে যেমন সংসারের অনিত্যতা, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি ও প্রেমভাব জাগাইয়া তুলে, এমন আর কিছুতেই নহে। রূপের গর্ব, ঐশ্বর্যের অভিমান, বাসনার আসক্তি হইতে মানুষ আপনাকে যদি নির্মুক্ত করিতে চাহে, তাহা হইলে তার পক্ষে হরিনাথের সঙ্গীত এক অমোঘ ব্রহ্মাস্ত্র-স্বরূপ। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর প্রভৃতি জেলার অনেক লোকই কাঙ্গাল হরিনাথের এই সকল সাধন সঙ্গীত শ্রবণে মনে করিতেন হরিনাথ দেবতা। উপলক্ষে উপলক্ষে কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ যখন যে স্থানে গমন করিয়াছেন, তখনই সেই স্থান হরিনাথের বাউলসঙ্গীতের পবিত্র স্রোতে প্লাবিত হইয়া গিয়াছে। বাংলা ১২৮৭ সালে ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউলগানের দল গঠিত হয়। এই দলকে লোকে রসিকতা করে ‘ভূতের দল’ও বলত। কাঙাল হরিনাথের এই দল-গঠন ও বাউলগান রচনার প্রেরণা এসেছিল বাউলসাধক লালন ফকিরের (১৭৭৪-১৮৯০) কাছ থেকে। উনিশ শতকের এই দুই গ্রামীণ এলিট - লালন ও কাঙালের মধ্যে যে সখ্য-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা ছিল কীর্তিময় এবং সহমর্মিতা ও মৈত্রীর স্মারক। লালন-আবিষ্কারে হরিনাথের ভূমিকা যেমন পথিকৃতের, তেমনই হরিনাথের অন্তর্জগতের পরিবর্তন, মরমি-ভাবনায় সমর্পণ ও সেই সূত্রে বাউলগান রচনার মূলে রয়েছে লালন সাঁইয়ের একান্ত প্রভাব। একদিকে লালন যেমন হরিনাথের মনে মরমিভাব ও অধ্যাত্মচেতনার বীজ বপন করেছিলেন, অপরদিকে কাঙালের বিপন্ন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে লালন আন্তরিক বন্ধুকৃত্য ও সামাজিক কর্তব্যও পালন করেছিলেন। পথ ও পন্থা ভিন্ন হলেও উভয়েই ছিলেন পার্থিব-আকাঙক্ষামুক্ত মানব-মিলনপ্রয়াসী লোকায়ত সাধনপথের মরমি-পথিক। এক্ষেত্রে দুজনেরই ‘অমোঘ অস্ত্র’ ছিল তাঁদের গান - সে-গান কেবল দেহতত্ত্বের নয়, মানবতন্ত্রের ও জীবনসত্যের অনুষঙ্গে ভাবসাধনারও গান। লালনের সঙ্গে কাঙালের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই অন্তরঙ্গতার সূত্রেই লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল-কুটিরে আসতেন। অপরদিকে কাঙালও গিয়ে আসর জমাতেন ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায়। কাঙাল তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় জমিদারের প্রজা-পীড়নের সংবাদ প্রকাশ করে বিপন্ন হন। তাঁর সেই দুঃসময়ে লালন ফকির শিষ্য-শাবকদের সঙ্গে নিয়ে আক্রান্ত কাঙালের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেন। সেই লালন একদিন কাঙাল-কুটিরে এসে তাঁর মরমি বাউলসংগীত পরিবেশন করলে হরিনাথের শিষ্যদের মনে তা গভীর দাগ কাটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র প্রস্তাব-মতো একটি বাউলের দল গঠনের চিন্তা সকলকে প্রাণিত করে। ফলে সঙ্গে-সঙ্গেই ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতা দিয়ে গান রচিত হয় - ‘ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশী সত্য-পথের সেই ভাবনা’। গ্রামবার্ত্তার সহযোগী ও ছাপাখানার কর্মীদের এই অভিনব ‘ফিকির’ হরিনাথের সাগ্রহ অনুমোদনই শুধু লাভ করল না, কাঙাল স্বয়ং তক্ষনি গান রচনায় উদ্যোগী হলেন। ‘আমি কোরব এ রাখালী কতকাল।/ পালের ছটা গরু, ছুটে কোরছে আমায় হাল-বেহাল’ - এই হলো কাঙাল-রচিত প্রথম গান। এরপর হরিনাথের মনে গানের জোয়ার এলো, একের পর এক রচিত হতে লাগল মনোহর সব বাউলগান।
কয়েকদিন
পরেই হাতে এলো হরিনাথের দিনলিপি,সেটা পড়তে পড়তে যেন অন্য একজনকে খুঁজে পেলাম।যাকে খুঁজে
পেলাম সেই হরিনাথ বাউল,তিনি কি বলছেন নিজের সম্পর্কে পাতার পরে পাতায় তিনি ‘ফিকিরচাঁদের দল’ ও বাউলগান রচনার ফলাফল সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন :কাঙাল হরিনাথ, পূবর্ববঙ্গের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার নিকটে তাঁহার বাউলসঙ্গীতের দ্বারাই অসামান্য লোক বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। এই বাউলসঙ্গীতের সহজ সরল প্রাণস্পর্শী কথায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবর্বশ্রেণীর লোকই মুগ্ধ হইতেন। অল্পদিনের মধ্যে বাউলসঙ্গীতের মধুর উদাস সুর হাটে, ঘাটে, মাঠে, নৌকাপথে সবর্বত্রই শ্রুত হইত।
হরিনাথ বাউলগানের একটি ভিন্ন ‘ঘরানা’ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ‘কাঙাল’ ও ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতায় পরমার্থসূচক যেসব বাউলাঙ্গের মরমিগান রচনা করেন তার সংখ্যা প্রায় হাজারের কোঠায়। তাঁর এই বাউলসংগীতের স্বরূপ ও জনমনে তার প্রভাব সম্পর্কে জানা যায় :
অনেক সঙ্গীতে সংসারের অনেক সুখদুঃখের কথা ধ্বনিত হইয়াছে বটে, কিন্তু কাঙ্গাল হরিনাথের বাউলসঙ্গীতে হৃদয়ের মধ্যে যেমন সংসারের অনিত্যতা, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি ও প্রেমভাব জাগাইয়া তুলে, এমন আর কিছুতেই নহে। রূপের গর্ব, ঐশ্বর্যের অভিমান, বাসনার আসক্তি হইতে মানুষ আপনাকে যদি নির্মুক্ত করিতে চাহে, তাহা হইলে তার পক্ষে হরিনাথের সঙ্গীত এক অমোঘ ব্রহ্মাস্ত্র-স্বরূপ। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর প্রভৃতি জেলার অনেক লোকই কাঙ্গাল হরিনাথের এই সকল সাধন সঙ্গীত শ্রবণে মনে করিতেন হরিনাথ দেবতা। উপলক্ষে উপলক্ষে কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ যখন যে স্থানে গমন করিয়াছেন, তখনই সেই স্থান হরিনাথের বাউলসঙ্গীতের পবিত্র স্রোতে প্লাবিত হইয়া গিয়াছে। বাংলা ১২৮৭ সালে ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউলগানের দল গঠিত হয়। এই দলকে লোকে রসিকতা করে ‘ভূতের দল’ও বলত। কাঙাল হরিনাথের এই দল-গঠন ও বাউলগান রচনার প্রেরণা এসেছিল বাউলসাধক লালন ফকিরের (১৭৭৪-১৮৯০) কাছ থেকে। উনিশ শতকের এই দুই গ্রামীণ এলিট - লালন ও কাঙালের মধ্যে যে সখ্য-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা ছিল কীর্তিময় এবং সহমর্মিতা ও মৈত্রীর স্মারক। লালন-আবিষ্কারে হরিনাথের ভূমিকা যেমন পথিকৃতের, তেমনই হরিনাথের অন্তর্জগতের পরিবর্তন, মরমি-ভাবনায় সমর্পণ ও সেই সূত্রে বাউলগান রচনার মূলে রয়েছে লালন সাঁইয়ের একান্ত প্রভাব। একদিকে লালন যেমন হরিনাথের মনে মরমিভাব ও অধ্যাত্মচেতনার বীজ বপন করেছিলেন, অপরদিকে কাঙালের বিপন্ন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে লালন আন্তরিক বন্ধুকৃত্য ও সামাজিক কর্তব্যও পালন করেছিলেন। পথ ও পন্থা ভিন্ন হলেও উভয়েই ছিলেন পার্থিব-আকাঙক্ষামুক্ত মানব-মিলনপ্রয়াসী লোকায়ত সাধনপথের মরমি-পথিক। এক্ষেত্রে দুজনেরই ‘অমোঘ অস্ত্র’ ছিল তাঁদের গান - সে-গান কেবল দেহতত্ত্বের নয়, মানবতন্ত্রের ও জীবনসত্যের অনুষঙ্গে ভাবসাধনারও গান। লালনের সঙ্গে কাঙালের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই অন্তরঙ্গতার সূত্রেই লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল-কুটিরে আসতেন। অপরদিকে কাঙালও গিয়ে আসর জমাতেন ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায়। কাঙাল তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় জমিদারের প্রজা-পীড়নের সংবাদ প্রকাশ করে বিপন্ন হন। তাঁর সেই দুঃসময়ে লালন ফকির শিষ্য-শাবকদের সঙ্গে নিয়ে আক্রান্ত কাঙালের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেন। সেই লালন একদিন কাঙাল-কুটিরে এসে তাঁর মরমি বাউলসংগীত পরিবেশন করলে হরিনাথের শিষ্যদের মনে তা গভীর দাগ কাটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র প্রস্তাব-মতো একটি বাউলের দল গঠনের চিন্তা সকলকে প্রাণিত করে। ফলে সঙ্গে-সঙ্গেই ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতা দিয়ে গান রচিত হয় - ‘ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশী সত্য-পথের সেই ভাবনা’। গ্রামবার্ত্তার সহযোগী ও ছাপাখানার কর্মীদের এই অভিনব ‘ফিকির’ হরিনাথের সাগ্রহ অনুমোদনই শুধু লাভ করল না, কাঙাল স্বয়ং তক্ষনি গান রচনায় উদ্যোগী হলেন। ‘আমি কোরব এ রাখালী কতকাল।/ পালের ছটা গরু, ছুটে কোরছে আমায় হাল-বেহাল’ - এই হলো কাঙাল-রচিত প্রথম গান। এরপর হরিনাথের মনে গানের জোয়ার এলো, একের পর এক রচিত হতে লাগল মনোহর সব বাউলগান।
শ্রীমান অক্ষয় ও শ্রীমান প্রফুল্লের গানগুলির মধ্যে আমি যে মাধুর্য পাইলাম, তাহাতে স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম, এইভাবে সত্য, জ্ঞান ও প্রেম-সাধনতত্ত্ব প্রচার করিলে, পৃথিবীর কিঞ্চিৎ সেবা হইতে পারে। অতএব কতিপয় গান রচনার দ্বারা তাহার স্রোত সত্য, জ্ঞান ও প্রেম-সাধনের উপায়স্বরূপ পরমার্থপথে ফিরাইয়া
আনিলাম এবং ফিকিরচাঁদের আগে ‘কাঙ্গাল’ নাম দিয়া দলের নাম ‘কাঙ্গাল-ফিকিরচাঁদ’ রাখিয়া তদনুসারেই গীতাবলীর নাম করিলাম।... অল্পদিনের মধ্যেই কাঙ্গাল-ফিকিরচাঁদের গান নিমণশ্রেণী হইতে উচ্চশ্রেণীর লোকের আনন্দকর হইয়া উঠিল। মাঠের চাষা, ঘাটের নেয়ে, পথের মুটে, বাজারের দোকানদার এবং তাহার উপর শ্রেণীর সকলেই প্রার্থনা সহকারে ডাকিয়া কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদের গান শুনিতে লাগিলেন।
ফিকিরচাঁদের গানে মানুষের মনে ভাবের বান ডাকল। এ-গানের সুর ছড়িয়ে পড়ল গ্রাম থেকে শহরে, প্রান্তর থেকে জনপদে। নৌকার মাঝি, মাঠের কৃষক, প্রান্তরের রাখাল, মসিজীবী মধ্যশ্রেণি সকলকেই অধিকার করল এই গান। ক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হলেন বিষাদ-সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন। ‘মশা’ ভণিতায় রচনা করলেন বাউলাঙ্গের অনেক গান। ব্রহ্মজ্ঞানী সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে গভীরভাবে স্পর্শ করল কাঙালের গান। এই গান তাঁর অন্তর্জীবনে আনল এক বিরাট পরিবর্তন। ব্রাহ্মসমাজের প্রচারের কাজে এই গান হয়ে উঠল এক শক্তিশালী বাহন।তখন আবার কয়েকদিন আগে পড়ায় ফিরতে হলো যেই বইয়ে এই বিস্ময়কর ভাববিপস্নবের কথা স্মরণ করে জলধর সেন বলেছেন :
কে জানিত যে, আমাদের অবসর সময়ের খেয়াল হইতে যে সামান্য গানটি বাহির হইয়াছিল, তাহার তেজ এক অধিক! কে জানিত যে, এই কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদের সঙ্গীতে সমস্ত পূবর্ববঙ্গ, মধ্যবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ এবং আসাম প্রদেশ ভাসিয়া যাইবে। কে জানিত যে, সামান্য বীজ হইতে এমন প্রকা- বৃক্ষ জন্মিবে! প্রিয়তম অক্ষয়কুমার সত্যসত্যই বলিয়াছেন যে, ‘এমন যে হইবে তাহা ভাবি নাই। এমন করিয়া যে দেশের জনসাধারণের হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত করা যায়, তাহা জানিতাম না।’এরই মাঝে পড়া হয়ে গেছে বেশ কিছু বই,তাদের লেখায় যতটা জানছি জানার জোয়ার ততই প্রবল হচ্ছে।হরিনাথ কে জানছি নাকি অতীত কোন বিস্ময়ে হারিয়ে যাচ্ছি বুঝতে পারছিনা।দিদার কথা মনে পড়ে,মাকেও….
হরিনাথের বাউলগান সমাজ-মানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর গানের প্রেরণা ও প্রভাব সমকাল ও উত্তরকালের সংগীত-রচয়িতারা অস্বীকার করতে পারেননি। ‘ফিকিরচাঁদে’র দলভুক্তদের ওপর কাঙালের গানের প্রভাব অনেকটা অনিবার্যভাবেই পড়েছে। মীর মশাররফ হোসেন মূলত কাঙালের প্রেরণাতেই সংগীত রচনায় হাত দেন এবং ফিকিরচাঁদের দলের একজন সৃষ্টিশীল সদস্য হিসেবে গণ্য হন। তাঁর রচিত বাউলগানের কিছু-কিছু লহরী (১৮৮৭) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কবি দাদ আলী কাঙাল হরিনাথের প্রভাবে কিছু বাউলাঙ্গের গান রচনা করেন। তাঁর আশেকে রাসুল (প্রথম খ-, ১৯৭০) গ্রন্থে ‘ফিকিরচাঁদের স্বরে রচিত গজল’ নামে কয়েকটি গান সংকলিত হয়েছে, যা হরিনাথের প্রেরণা ও প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।তন্ত্রাচার্য শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব রচিত গানেও কাঙালের প্রভাব দুর্লক্ষ্য নয়। কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের
ভক্তি-আশ্রিত সংগীত-রচনার অন্যতম প্রেরণাও যে কাঙাল হরিনাথ, সে-সম্পর্কে ড. সুকুমার সেনের মন্তব্য :
ইনি [রজনীকান্ত] ভক্তিরসের গানের প্রেরণা পাইয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান এবং কাঙাল হরিনাথের বাউলগান হইতে।... রজনীকান্তের কোন কোন গানে ‘কান্ত’ ভণিতা দেখা যায়। এই ভণিতা দেওয়ার রীতি হরিনাথের রচনাসূত্রে পাওয়া।
শুধু তাই নয়, কাঙালের বাউলগান রবীন্দ্রনাথকেও স্পর্শ করেছিল বলে জানা যায়।
হরিনাথের ফিকিরচাঁদের দলের অনুসরণে কুমারখালী ও আশপাশ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সংগীতদলের আবির্ভাব হয়। মীর মশাররফ হোসেন জানিয়েছেন :
নদীয়া জিলার অমত্মঃপাতী কুমারখালীতে ফিকিরচাঁদ ফকীরের আবির্ভাব হয়। দেখাদেখি, আজবচাঁদ, রসিকচাঁদ দেখা দেন।
অন্যত্রও এই সংগীতদল সম্পর্কে উল্লেখ মেলে :
... এবার ঝুলনে ফিকিরচাঁদ একদিন গরিবচাঁদ একদিন এবং ঘাসখাল হইতে লালনচন্দ্র চক্রবর্তীর আজবচাঁদের দল একদিন ৩ দিন গান হইল।
হরিনাথের ফিকিরচাঁদের দলের সাফল্যের প্রেরণায় বিভিন্ন ‘চাঁদে’র দলের গানে-গানে গ্রামাঞ্চল মেতে ওঠে। এর
সমকালীন-সাক্ষ্য মেলে কুমারখালীর প্রাণকৃষ্ণ অধিকারীর বর্ণনায় :
ক্রমে ১২৯০ সাল আসিল এই সময় কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ফিকিরচাঁদ ফকিরের গানের বড়ই ধূম, গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই গান শুনিবার জন্য পাগল। প্রথমে যখন গান বাহির হইল তখন সকলের বাড়ী বাড়ী গান গাহিয়া যাইতে লাগিল, খেলকা, চুল দাড়ি, টুপী ব্যবহার [করিত] এবং কাহার কাহার পায়ে নেপুরও থাকিত, বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ডুগি, খোমক, খুঞ্জুরি, একতারা প্রভৃতি ফকিরের সাজে তাহারা বাহির হইত পরে নিয়ম করিল যাহার বাড়ী গান হইবে তিনি একখানা নিমন্ত্রণপত্র দিলেই তাহারা আসিয়া গান গাহিয়া যাইবে। ফিকিরচাঁদ ফকিরের দল দেখিয়া শেষে গ্রামে গ্রামে অনেক দল সৃষ্টি হইল। কোনও স্থানে দুই দলে পালস্নাও হইত। আমিও ঐ দেখাদেখি কতকগুলি বালক লইয়া বালকচাঁদের দল করিলাম। সেই সময় আকাশে পূবর্ব-দক্ষিণ কোণে ভয়ানক একটি ধুমকেতু উঠে তাহার প্রকা- লেজ দেখিতে আশ্চর্য্যজনক। রাত্রি এগারটার সময় উঠিত। এলঙ্গী গ্রামের প্রসন্নচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে ফিকিরচাঁদের দলে ছিলেন গানও প্রস্ত্তত করিতেন। কোন এক বিষয় লইয়া প্রফুলস্নচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সহিত মনমালিন্য হওয়ায় ঐ দল ত্যাগ করিয়া লোহারাম প্রামাণীকের সঙ্গে যোগ দিয়া তিনি গরিবচাঁদের ভণিতা দিয়া দল সৃষ্টি করিলেন। ফিকিরচাঁদে ও গরিবচাঁদে দুই দলে খুব পালস্না বাধিত তাহা শুনিতে অত্যন্ত আমোদজনক হইত। ইহাদের বিছানা লাগিত না পানতামাক লাগিত না কেবল একখানা নিমন্ত্রণপত্র পাইলেই সন্তুষ্ট যিনি পত্র দিতেন তাহার বাড়ীই গান হইত, জাতিবিচার ছিল না।
No comments:
Post a Comment